মুসলিম নয়, হিন্দুদের ফিরিয়ে নিতে আগ্রহী মিয়ানমার

মুসলিম নয়, হিন্দুদের ফিরিয়ে নিতে আগ্রহী মিয়ানমার

মিয়ানমারের রাখাইনে মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় দুই সপ্তাহ আগেও মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, ইমিগ্রেশন ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের আনাগোনায় সরব ছিল। কথা ছিল প্রত্যাবাসিত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার সীমান্তে ঢুকলেই সেখানরা একটি ব্রিজের গোড়াতে অপেক্ষারত কর্মকর্তারা শরণার্থীদের গ্রহণ করবেন। কিন্তু দিনভর অপেক্ষা করেও কোনো রোহিঙ্গা না আসায় সব আয়োজন শেষ করে কর্মকর্তারা ফিরে যান।

 

গত শুক্রবার সেখানে বিবিসি বার্মিজ ভাষা বিভাগের এক সাংবাদিকের তোলা ভিডিওতে দেখা যায়, পুরো এলাকাই জনমানবশূন্য, নীরব। সীমান্ত সেতুটির ফটক তালাবদ্ধ।কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যাচ্ছে, প্রত্যাবাসন নিয়ে ভেতরে ভেতরে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে মিয়ানমার সরকার।তবে তারা শুধু টেকনাফের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় থাকা কয়েকশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী শরণার্থীকে নেয়ার জন্যই এ তৎপরতা চালাচ্ছে।বিবিসি বার্মিজ বিভাগের সম্পাদক সো উইন থান বলছেন, ‘এখানে মিয়ানমার সরকার মনে করছে, প্রত্যাবাসন না হওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের ব্যর্থতা আছে। কারণ তাদের ফেরত পাঠানোর দায়িত্ব ছিলো বাংলাদেশের। মিয়ানমার সরকার বলছে, তারা ফেরত নেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। কিন্তু সেদিন একজনও ওপার থেকে আসেনি। তবে আমরা জানতে পেরেছি, মিয়ানমার সরকার এখন বাস্তুচ্যুত হিন্দুদের ফেরত আনা নিয়ে কাজ করছে।’

 

কিন্তু মিয়ানমার সরকার হিন্দু শরণার্থীদের ফেরত নিতে কেন আগ্রহী হচ্ছে- এমন প্রশ্নে উইন থান জানাচ্ছেন, ‘মুসলিম রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় ফিরতে ইচ্ছুক না হলেও হিন্দু শরণার্থীরা স্বেচ্ছায় ফিরতে চায়। আর মিয়ানমার সরকারও চায় প্রত্যাবাসন শুরু করতে।’উইন থান নিশ্চিত করেছেন, গেল বৃহস্পতিবার মিয়ানমারে আসা জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূতকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।

নিরাপত্তা নিশ্চিতে কী করছে মিয়ানমার?

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের দ্বিতীয় দফা প্রত্যাবাসন ব্যর্থ হওয়ার এক সপ্তাহ পর প্রত্যাবাসনে কী কী বাধা আছে তা খতিয়ে দেখতে মিয়ানমারে যান জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত ক্রিস্টিন এস বার্গনার।মূলত প্রত্যাবাসনে বাধা হিসেবে রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব না পাওয়া এবং নিরাপত্তা নিয়ে ভীতির যেসব কথা বলেছেন, সে বিষয়ে জাতিসংঘ দূতকে নতুন করে মিয়ানমার সরকার আশ্বস্ত করেছে বলেই খবর পাওয়া যাচ্ছে।বলা হচ্ছে, রোহিঙ্গারা ফেরত গেলে তাদের অন্তবর্তীকালীন থাকার ব্যবস্থা প্রস্তুত আছে। বিবিসি বার্মিজের তোলা ভিডিওতে দেখা যায়, উত্তর রাখাইনে কাঁটাতারের বেষ্টনীর মধ্যে সারিবদ্ধ ভাবে রোহিঙ্গাদের থাকার জন্য নতুন নতুন ঘর নির্মাণ করা হয়েছে।

 

মিয়ানমার সরকার বলছে, অন্তর্র্বতীকালীন এই আবাসন থেকেই পরে তাদের ধাপে ধাপে নিজ গ্রামে ফেরত নেয়া হবে।যদিও বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের আশংকা অন্তর্র্বতীকালীন এসব ক্যাম্প হবে তাদের জন্য আরেক বন্দীশালা। এ ছাড়া ফেরার পর সরকার তাদের কতটা নিরাপত্তা দেবে তা নিয়েও সংশয় আছে রোহিঙ্গাদের।

নিরাপত্তা পরিস্থিতি

নিরাপত্তা নিয়ে মিয়ানমার সরকার বারবার আশ্বস্ত করলেও মিয়ানমারের মানবাধিকার কর্মী নিকি ডায়মন্ড অবশ্য তা নিয়ে বেশ সন্দিহান।তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, নিরাপত্তা এবং সক্ষমতা বিবেচনায় মিয়ানমার সরকার এখনো প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুত নয়। সরকারের মন্ত্রীরা এটা করেছি, ওটা করেছি বলছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে কী করা হয়েছে তা সরেজমিনে যাচাই করার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘উত্তর রাখাইনে এখনো স্থানীয় বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারি আর্মির লড়াই চলছে। পরিস্থিতি নিরাপদ নয়। এমনকি সংঘাতের ফলে অভ্যন্তরীণভাবে যে কয়েক হাজার লোক বাস্তচ্যুত হয়ে রাখাইনের ভেতরেই বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে, সরকার তাদেরকেই এখনো নিজ গ্রামে ফেরত আনতে পারেনি। সেখানে বাংলাদেশ থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের কিভাবে ফেরত আনবে, থাকার ব্যবস্থা করবে আর নিরাপত্তা দেবে?’

নাগরিকত্ব ইস্যু

দুই দফায় প্রত্যাবাসন ব্যর্থ হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ বলা হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের দাবি পূরণ না হওয়া। তবে মিয়ানমার সরকার নির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করে তাদের ভাষায় ‘যোগ্য’দের নাগরিকত্ব দেয়া হবে বলে আশ্বস্ত করছে।বিবিসি বার্মিজের সম্পাদক সো উইন থান বলছেন, নাগরিকত্বের প্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে বলেই তারা ধারণা করছেন। তিনি বলছেন, ‘সরকার ঘোষণা করেছে যে, উদ্বাস্তুরা ফিরলেই নাগরিকত্বের প্রক্রিয়া শুরু হবে। এটা হবে ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী। এখানে বিভিন্ন গ্রামে যারা বাস করতেন, ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের পারিবারিক নিবন্ধন রয়েছে। আবেদন পাওয়ার

 

পর এসব ডকুমেন্টস ভেরিফিকেশন করা হবে। আইন অনুযায়ী আবেদনকারীরা কোয়ালিফাইড হলে তাদের ভেরিফিকেশন কার্ড দেয়া হবে। তারপর নাগরিকত্ব।’ অবশ্য তিনি জানাচ্ছেন, এসব প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় নিয়ে নিতে পারে।আবার একই সঙ্গে এখানে উদ্বেগেরও বিষয় আছে। কারণ, অতীতে ভেরিফিকেশন কার্ড পাওয়ার পরও নাগরিকত্ব সার্টিফিকেট না দেয়ার অনেক উদাহারণ আছে।

রোহিঙ্গাদের মনোভাব

একদিকে নিরাপত্তা নিয়ে আশ্বাস অন্যদিকে ফেরত যাবার পর প্রমাণসাপেক্ষে নাগরিকত্বের সুবিধায় কোনোমতেই ভরসা নেই রোহিঙ্গাদের। কক্সবাজারের বালুখালি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি মোহাম্মদ ইসলাম বলেন, তারা প্রত্যাবাসনের পরে নয়, বরং প্রত্যাবাসনের আগেই নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে চান।মাঝি মোহাম্মদইসলাম বলছিলেন, ‘আমরা তো আগেই বলেছি যে, আমরা ফেরত যাবার আগেই নাগরিকত্ব চাই। কারণ ফেরত যাবার পরে আমাদের যে নাগরিকত্ব দেবে, তার নিশ্চয়তা নেই। আমাদের নাগরিকত্ব দিয়ে ফেরত নিলে আমরা নিজেরাই আমাদের গ্রামে গিয়ে ঘরবাড়ি নির্মাণ করতে প্রস্তুত আছি। কিন্তু সেটা তো হচ্ছে না।’

 

এদিকে প্রথম দফার মতো দ্বিতীয়বারেও প্রত্যাবাসন ব্যর্থ হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের মধ্যেও উদ্বেগ বেড়েছে। ফেরত না যেতে রোহিঙ্গাদের উস্কানি দেয়া হচ্ছে বলে সন্দেহের কথা জানিয়েছে সরকার। বেশ কয়েকটি এনজিওর কার্যক্রমও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। যদিও প্রত্যাবাসনের জন্য নিরাপদ পরিবেশ ও রোহিঙ্গাদের দাবি পূরণের পুরোটাই নির্ভর করছে মিয়ানমারের ওপর।মিয়ানমারের মানবাধিকার কর্মী নিকি ডায়মন্ড এক্ষেত্রে জোর দিয়েছেন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে রোহিঙ্গা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও যুক্ত করতে। কিন্তু প্রত্যাবাসনের এ পর্যায়ে এসে নতুন করে সেটা কতটা সম্ভব তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© ২০১৯ | ভিউয়ার বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বসত্ব ® সংরক্ষিত

Design BY NewsTheme