এই মসজিদের নির্মাণ কাজে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন হজরত মুহাম্মদ (সা:)

নবীর ম’সজিদ। আরবিতে বলা হয় ম’সজিদে নববী। হ’জরত মুহাম্ম’দ সা: নিজ হাতে নির্মাণ করেন এ ম’সজিদ। ম’সজিদের নির্মাণকাজে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন তিনি।

 

অবস্থান সৌদি আরবের ম’দিনার কেন্দ্রস্থলে। হ’জরত মুহাম্ম’দ সা: ম’ক্কা থেকে ম’দিনায় হিজরত করার বছর ৬২২ সালে এ ম’সজিদ নির্মাণ করেন। ম’সজিদের পাশেই ছিল হ’জরত মুহাম্ম’দ সা: এর বসবাসের ঘর। ম’সজিদের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে রয়েছে একটি সবুজ গম্বুজ।

 

গম্বুজটি নবীর ম’সজিদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ এ গম্বুজের নিচেই রয়েছে শেষ নবী হ’জরত মুহাম্ম’দ সা:-এর রওজা মোবারক। হ’জরত মুহাম্ম’দ সা: ম’সজিদের পাশে যে ঘরে ই’ন্তেকাল করেন সেখানেই তাকে দাফন করা হয়।

 

পরে ম’সজিদ সম্প্রসারণের মাধ্যমে তার রওজা মোবারক ম’সজিদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রওজা মোবারকের ওপরে গম্বুজ নির্মাণ করা হয়। ১২৭৯ সালে প্রথম এখানে একটি কাঠের গম্বুজ নির্মাণ করা হয় এবং পরে অনেকবার সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করা হয় এটি।

 

বর্তমানে যে গম্বুজটি দেখা যাচ্ছে সেটি নির্মিত হয় ১৮১৮ সালে উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদের সময়। হ’জরত মুহাম্ম’দ সা: নবুওয়াত লাভের পর ম’সজিদে নববীকে তৃতীয় ম’সজিদ হিসেবে গণ্য করা হয়। ম’ক্কা থেকে ম’দিনায় হিজরত করার পথে ম’দিনা থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে কুবা নামক স্থানে হ’জরত মুহাম্ম’দ সা: একটি ম’সজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন।

 

এটিকেই সে সময়ে প্রথম ম’সজিদ হিসেবে গণ্য করা হয়। অবশ্য ইরিত্রিয়ার মাসওয়ায় অবস্থিত সাহাবা ম’সজিদকেও কেউ কেউ নবীর সময়ে নির্মিত প্রথম ম’সজিদ হিসেবে আখ্যায়িত করেন, যা হোক কুবা ম’সজিদের ভিত্তি স্থাপন এবং নবীর ম’সজিদের সরাসরি নির্মাণ কাজে অংশ নেন রাসূলে পাক সা:।

 

বর্তমানে মু’সলমানদের কাছে পবিত্র কাবার পর ম’সজিদে নববীকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে গণ্য করা হয়। হাজীরা সবাই পরিদর্শন করেন এ ম’সজিদ। কারণ এ ম’সজিদের মধ্যে রয়েছে হ’জরত মুহাম্ম’দ সা:-এর রওজা মোবারক।

 

ম’ক্কা থেকে হিযরতের পর জীবনের বাকি বছরগুলো ম’দিনাতেই কা’টান তিনি। তবে হ’জরত মুহাম্ম’দ সা:-এর সময়ে নির্মিত ম’সজিদের অবকাঠামো বর্তমানে বিদ্যমান নেই। শুরুতে ম’সজিদটি ছিল মূলত দেয়াল ঘেরা একটি খোলা স্থান। ওহী তথা কুরআন নাজিলে, মানুষের সম্মিলন স্থান এবং বিচার ফয়সালা সম্পন্ন হতো এখানে।

 

কুরআন শেখার জন্য একটি উঁচুস্থান ছিল। ম’সজিদের কিছু অংশে ছাদের ব্যবস্থা ছিল যার খুঁটি ছিল খেজুর গাছের। আর কিবলা ছিল জেরুসালেমের দিকে। পরে কুরআনে কিবলা পরিবর্তনের আয়াত নাজিল হলে কিবলাও পরিবর্তন করা হয়।

 

ম’সজিদটি যে স্থানে নির্মিত হয় তার এক অংশে খেজুর শুকানো হতো। মালিক ছিলেন সাহল ও সুহাইল। ম’সজিদ নির্মাণের জন্য তারা এটি দান করতে চাইলে হ’জরত মুহাম্ম’দ সা: দান গ্রহণ না করে কিনে নেন। প্রথমে ম’সজিদটির আয়তন ছিল ১০০/১১৬.৯ ফুট। দেয়ালের উচ্চতা ১১.৮ ফুট। ম’সজিদের তিনটি দরজা ছিল।

 

খায়বার যু’দ্ধের পর ম’সজিদ চার দিকে সম্প্রসারণ করা হয়। পশ্চিমে তিন সারি খুঁটি নির্মাণ করা হয় এবং এ স্থান সালাতের জন্য ব্যবহার করা হয়। এরপর হ’জরত উম’রের (রা:) সময় এ ম’সজিদ সম্প্রসারণ করা হয়। হ’জরত উসমানের (রা:) সময় ৬৫৯ সালে পুরো ম’সজিদ ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করা হয়। খেজুর গাছের খুঁটির পরিবর্তে পাথরের খুঁটি ব্যবহার করা হয়। এভাবে পরে বিভিন্ন সময় সংস্কার আর সম্প্রসারণ চলতে থাকে।

 

৭০৭ সালে উমাইয়া খলিফা আল ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিক ম’সজিদে নববীর ব্যাপক সংস্কার করেন। তিন বছরব্যাপী ব্যয়বহুল সংস্কারের মাধ্যমে ম’সজিদের চার দিকে চারটি মিনারও নির্মাণ করা হয় প্রথমবারের মতো। নির্মাণকাজে তিনি বাইজানটাইন থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র আনয়ন করেন।

 

ম’সজিদের মধ্যে দেয়াল দিয়ে নবীর স্ত্রী’দের ঘরগুলোকেও আলাদা করা হয় এ সময়। এরপর আব্বাসীয় খলিফাদের সময়ও ম’সজিদের সংস্কার চলতে থাকে। ১৪৭৬ সালে ম’সজিদের গম্বুজটি পাথর দিয়ে নির্মাণ করা হয়। ১৮৩৭ সালে গম্বুজটিতে সবুজ রঙ করা হয়।

 

১৮৫৯ সালে উসমানীয় সুলতান আব্দুল মাজিদ ১৩ বছরব্যাপী ম’সজিদ সংস্কার শুরু করেন। এ সময় ম’সজিদের স্থাপত্যশৈলী, অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য অনেক বৃদ্ধি করা হয়। ব্যবহার করা হয় অনেক দামি জিনিসপত্র। ১৯৩২ সালে বর্তমান সৌদি রাজ পরিবারের শাসন প্রতিষ্ঠার পর ম’সজিদের ব্যাপক সংস্কার, সম্প্রসারণ এবং আধুনিকায়ন করা হয়।

 

বাদশা ইবনে সৌদ, বাদশা ফয়সাল, বাদশা ফাহাদ প্রত্যেকের সময়ই বিপুল অর্থ ব্যয়ে ম’সজিদ সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়। ২০১২ সালে ঘোষণা করা হয় ছয় বিলিয়ন ডলারের সম্প্রসারণ প্রকল্প, যা শেষ হলে ম’সজিদে মু’সল্লি ধারণক্ষমতা হবে সর্বোচ্চ ২০ লাখ।

 

ম’সজিদে নববীর স্থাপত্য শৈলী, অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য মূল্যবান দ্রব্যাদির ব্যবহার, সাজসজ্জা আর জৌলুশ, ম’সজিদ চত্বরের বর্তমান অটোমেটিক ছাতা, অদূরে পাহাড় শ্রেণীসহ আর যত যা কিছুই বর্ণনা করা হোক না কেন কোনো কিছুই এ ম’সজিদের মূল আকর্ষণ বা সৌন্দর্যের কারণ নয়। এ ম’সজিদের প্রা’ণ, এর প্রতি মানুষের আকর্ষণ ভালোবাসা আর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হলো ম’সজিদের অভ্যন্তরে নবী পাক হ’জরত মুহাম্ম’দ সা:-এর রওজা মোবারক।

 

এ ম’সজিদ চত্বরে পা ফেলতেই যে কারো মনে ভেসে ওঠে এখানেই এক সময় কদম মোবারক ফেলতেন নবী পাক হ’জরত মুহম্ম’দ সা: এবং তার সাহাবীরা। আরো কত সহস্র স্মৃ’তি ভেসে ওঠে মানুষের মনে এ ম’সজিদের আশপাশের পরিবেশ ঘিরে।

মতামত দিতে চান?

Please enter your comment!
Please enter your name here