ট্রল থেকে কবে রেহাই পাবেন প্রবাসীর স্ত্রীরা?

495
পড়েছে

কয়েকদিন আগে ফেইসবুকে দেখলাম কিছু ব্যক্তি প্রবাসীদের স্ত্রীদের নিয়ে ট্রল করছে। তারা ফেইসবুকে ‘প্রবাসীদের স্ত্রীদের জীবন চক্র’, ‘স্বামী বিদেশ’, ‘স্বামী বিদেশ সমস্যা নাই’, ‘স্বামী বিদেশ থাকলে যা হয়’ ইত্যাদি নানা কুরুচিপূর্ণ বিষয় নিয়ে লিখছে।

 

ফেইসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন কয়েকশ ফেইবুক আইডি, ফ্যান ফেইজ, গ্রুপ আর ভিডিও পাওয়া যায়। কতটা নিচু মন-মানসিকার অধিকারী হলে প্রবাসীদের স্ত্রীদের নিয়ে এমন নিম্নশ্রেণির ট্রল করা যায় তা ভাবতেই আমার গা গুলিয়ে আসে৷ একটু আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্য জীবিকার তাগিদে যে প্রবাসীরা বছরের পর পর বছর দেশের বাইরে থাকেন, বিদেশ থেকে রেমিটেন্স পাঠান তাদের স্ত্রীরা দেশের বাড়িতে মানসিক পীড়ায় থাকেন। তাদের নিয়ে এমন অশ্লীল ট্রল, সস্তা কৌতুক, বমি উদ্রেকর বানানো গল্প আমাকে ব্যথিত করেছে।

 

আজ আবার একটি ট্রল চোখে পড়ল। সেখানে আছে ‘আমেরিকা: ইমু (একটা অ্যাপ), বাংলাদেশ: ইমু (স্বামী বিদেশ)’। ট্রলকারীদের ভাবখানা এরকম বাংলাদেশে শুধু প্রবাসীদের স্ত্রীরাই ইমু ব্যবহার করেন। অশিক্ষিত মানুষের পাশাপাশি শিক্ষিত মানুষেরাও এসবে অংশ নিচ্ছেন, লাইক কমেন্ট করছেন, কখনও কখনও আরও সরস মন্তব্য করে যাচ্ছেন। আমাদের চরিত্র ঠিক না হলে, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ না থাকলে কী করে এগুবো আমরা? সংস্কৃতি না বদলালে মুখে মুখে আমরা প্রবাসীদের সম্মান জানিয়ে কী লাভ?

 

যারা এমন ট্রল করছেন তারা ট্রল করে যেন বুঝাতে চাচ্ছেন প্রবাসীরা তাদের পাকা ধানে মই দিয়েছেন৷ প্রবাসীরা তাদের চিরশত্রু, তাই তাদের আর তাদের স্ত্রীদের হেয়প্রতিপন্ন করা তাদের অধিকার। আর সেই পোস্টে হাসির রিঅ্যাক্ট কিংবা কমেন্ট করে তারা মঙ্গলগ্রহ জয় করে ফেলেছেন।এর আগেও দেখেছি ওমান প্রবাসী এক খেটে খাওয়া প্রবাসীকে নিয়ে ট্রল করতে৷ ওমান প্রবাসী সেই নোমান যিনি আমাদের মতো উচ্চশিক্ষিত নন, যিনি ফেইসবুকে আমাদের মতো দৈনিক সকাল বিকেল স্ট্যাটাস দেন না, তিনি তার স্ট্যাটাসের মাধ্যমে আমাদের কোনো ধরনের অনুভূতিকে আঘাত করেননি, যিনি আমাদের সাতেও নেই পাঁচেও ছিলেন না। তিনি আমাদের মতো সারাদিন ফেইসবুকে ট্রল কিংবা লাইক কমেন্ট করে সময় নষ্ট না করে কায়িক শ্রমে অর্জিত টাকা দেশে পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছেন। তাকে নিয়ে ট্রল করে আমরা বিরাট সাফল্য অর্জন করছি!

 

তার আইডির নাম ছিল ‘আমি নোমান থাকি ওমান’। ব্যস, এটুকুই তার অপরাধ। আর সেই অপরাধের শাস্তি হিসেবে তার টাইমলাইনে বিশ্বজয়ের আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে পোস্টে যাচ্ছেতাই কমেন্ট করছি, ব্যঙ্গ করছি, তাকে অপমান করেছি, হাজার-হাজার লাইক-শেয়ার দিয়ে তার শান্তি কেড়ে নিয়েছি। এমনকি তার ইনবক্সে উদ্ভট মেসেজ পাঠিয়ে আমরা আবার বীরদর্পে সেগুলোর স্ক্রিনশট বাজারজাত করে বাহুর পেশি ফুলিয়ে বীরত্ব দেখিয়েছি।পিপীলিকার মতো তার আইডিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছি, তিনি ব্যথিত হয়ে আইডি ডিঅ্যাক্টিভেট করেছিলেন। কিন্তু তাকে রেহাই দেইনি, এ মুহূর্তে ফেইসবুকে শোভা পাচ্ছে ‘আমি নোমান থাকি ওমান’ নামে অজস্র ফেইক আইডি ও একাধিক পেজ।

 

আরেকজন প্রবাসী ফেইসবুকে একটি ছবি আপলোড দিয়ে লিখেছিলেন ‘আই এম জার্মান’। এরপর বাকিটা ইতিহাস। তাকে নিয়েও ট্রল করি৷ ভদ্রলোক হয়ত আমাদের মতো ডিগ্রিধারী নন, একটু ভুল ইংরেজি লিখেছিলেন। তাই বলে তার উপরও ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে? কেউ একজন তার ইংরেজিটা শুধরে দিলে কী এমন ক্ষতি হতো! সেই ভদ্রলোক আমাদের ট্রল দেখে ফেইসবুক থেকে পালিয়েছেন। কিন্তু আজও আমাদের নোংরা মন-মানসিকতার পরিবর্তন হলো না।কোনোকিছু নিয়ে ট্রল কিংবা বাজে কমেন্ট করার আগে ভেবেচিন্তে দেখা উচিত৷ আমাদের একটু তামাশা অন্যের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে নাতো!

লেখক: সিঙ্গাপুর প্রবাসী বাংলাদেশি

মতামত দিতে চান?

Please enter your comment!
Please enter your name here